Thursday, 31 December 2015

শ্লোক ০৪

যল্লব্ধা পুমান্‌ সিদ্ধো ভবতি, অমৃতো ভবতি, তৃপ্তো ভবতি ||||


যা (পরম প্রেমস্বরূপ ও অমৃতস্বরূপ ভক্তি) লাভ করে মানুষ সিদ্ধ হয়, অমরত্ব লাভ করে ও তৃপ্ত হয়।


=========================================================================



অর্থঃ যে ভক্তি লাভ করে ভক্ত পূর্ণমনস্কাম হয়, তার সমস্ত উদ্দেশ্য সিদ্ধ হয়, সে অমরত্ব লাভ করে দিব্য হয়, চির পরিতৃপ্ত হয়।

ব্যাখ্যাঃ সর্বপ্রথম লক্ষণ এই ভক্তি লাভ করে মানুষ সিদ্ধ হয়, পূর্ণ হয়। এই সিদ্ধ হওয়ার অর্থ কিন্তু কতকগুলি অলৌকিক বিভূতি লাভ করা নয়। এখানে সিদ্ধির অর্থ অভিপ্সীত লক্ষ্যবস্তুর প্রাপ্তি। এখানে সিদ্ধ হওয়ার অর্থ সে তার প্রার্থিত বস্তু লাভ করেছে। আর সেই প্রার্থিত বস্তু অন্য কিছুই না, শুদ্ধা ভক্তিমাত্র অথবা একমাত্র ভগবান লাভ, অন্য কিছু নয়।
অলৌকিক শক্তিকেও সিদ্ধি বলে এবং সাধন পথে চলতে চলতে সাধকের এইরকম কিছু সিদ্ধি মাঝে মাঝে আপনিই আসে। কিন্তু প্রকৃত ভক্তের দৃষ্টি কখনও এদিকে যায় না। এই কথাটি বিশেষভাবে খেয়াল রাখা দরকার। কারণ সাধারণ মানুষের মধ্যে এটা প্রচলিত ধারণা যে যিনি ভক্ত তাঁর কাছে অলৌকিক ক্ষমতা থাকবেই আর যাঁদেরই মধ্যে এই শক্তির প্রকাশ দেখা যায় বা যাঁরা অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী হন, সাধারণ লোক সর্বদাই তাঁদের দিকে ধাবিত হয়। কিন্তু এটা পরিস্কারভাবে জানা দরকার এইসব সিদ্ধাই-এর সঙ্গে ভক্তির কোন সম্বন্ধ তো নেই-ই, উপরন্তু অনেক সময় অগ্রগতির পথে এগুলি বাধাই সৃষ্টি করে। এই সিদ্ধাই আর ভক্তির একত্র সমাবেশ হতে পারে না। আর যদি এ সিদ্ধাই কারও মধ্যে আবির্ভূতও হয় কিন্তু সে শক্তির তিনি যদি কখনও প্রয়োগ না করেন, তবে সে শক্তি না থাকারই সমান। প্রকৃত ভক্ত কখনও সচেতনভাবে তাঁর এই সিদ্ধি বা বিভূতি ব্যবহার করবেন না। ভক্ত সর্বদা এই বিষয়ে সতর্ক থাকবেন যেন এইসব বিভূতির প্রয়োগস্পৃহা তাঁকে লক্ষ্যভ্রষ্ট না করে, বিপথগামী না করে। বহু মহাপুরুষের জীবনে, অবতারদের জীবনে আমরা এইরকম নানা অলৌকিক শতির কাহিনী পড়েছি। বিশেষভাবে যীশুখ্রীষ্টের জীবনে এইরকম অনেক ঘটনা আমরা বাইবেলে পড়েছি।
অপরদিকে শ্রীরামকৃষ্ণের জীবনে আমরা দেখি যে একবার এক ব্যক্তি দক্ষিণেশ্বর মন্দিরে এসে তার ঘরে প্রবেশ করে বলে যে, আমরা শুনেছি এখানে একজন পরমহংস থেকেন যিনি নানারকম ওষুধ দেন। শ্রীরামকৃষ্ণ অত্যন্ত বিরক্ত হয়ে উত্তর দেন, না, না, এখানে নয়, অমুক জায়গায় যাও সেখানে এইরকম আকজন আছে যে এসব করে। কেন তিনি একথা বললেন? কেন না একজন শুদ্ধাত্মা ব্যক্তির পক্ষে এইরকম ক্ষমতা থাকার চিন্তাও তাঁর কাছে অত্যন্ত বিরক্তিকর মনে হয়েছিল। এই প্রসঙ্গের উল্লেখও তা৬র অস্বস্তির কারণ হয়েছিল। বহু সময়েই তিনি বলেছেন, অষ্টসিদ্ধির একটিও যদি কারও থাকে তার সে লক্ষ্য থেকে বহু দূরে পড়ে থাকবে।
তাই যদি হয় তবে যীশু বা অন্যদের জীবনে এইসব অলৌকিক ঘটনার উল্লেখ করার হেতু কি? কারণ এই যে আমরা সাধারণ লোকেরা এইসব ভালবাসি, আমরা এইসব শক্তি লাভ করতে চাই যাতে তার সাহায্যে জাগতিক কিছু সুখস্বাচ্ছন্দ্য লাভ করা যায়। অসুখ করলে যেমন চিকিৎসকের দ্বারস্থ হই, এও তেমনি। কিছু ঐহিক উন্নতির লোভে সাধুসন্তদের দ্বারস্থ হওয়া। এর সঙ্গে ভক্তির কোন যোগ নেই। শুনেছি একজন সাধু ছিলেন, অন্তত লোকে তাঁকে সাধু বলত, তিনি নাকি বলে দিতে পারতেন কত নম্বরের ঘোড়া রেসে জিতবে। বোম্বাই-এর কাছাকাছি কোথাও তিনি থাকতেন আর তাঁর আশ্রমের সামনে বহু লোকের সমাগম হতো, গাড়ি করেও প্রচুর লোক আসত। সকলের একটাই ইচ্ছা কোন্‌ ঘোড়া জিতবে জানা ও সেই সুবাদে কিছু অর্থ লাভ করা।
এখন এর সঙ্গে ভক্তির কি সম্পর্ক থাকতে পারে? বিন্দুমাত্রও না। এইরকম অনেক উদাহরণ আছে যার দ্বারা প্রমাণীত হয় যে প্রকৃত ভক্তি কি? সত্যকার ভক্ত কে তা আমরা বুঝতেই পারি না। প্রকৃত ভগবৎ প্রেমিকের কাছে যে কি চাইতে হয় তা বোঝার বুদ্ধিই যে সাধারণের কত কম এর দ্বারা তা প্রকট হয়। মানুষের দুর্বলতা, মুঢ়তা এমনই যে সে নিতান্ত পার্থিব কিছু লাভের আশায় সাধুকে কাজে লাগাতে চায়।
সূত্রে যে বলা হয়েছে ‘সিদ্ধঃ ভবতি’, এই সিদ্ধি স্বভাবত পূর্বোক্ত সিদ্ধি বা সিদ্ধাই থেকে স্বতন্ত্র। এই সিদ্ধির অর্থ আদর্শের চরিতার্থতা আর সে আদর্শ হলো জীবনের পূর্ণতা সাধন, ঈশ্বরে সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ, তাঁরই মধ্যে একাত্ম হয়ে যাওয়া। এই উদ্দেশ্য যাঁর জীবনে সফল হয়েছে তিনিই এই ভক্তিলাভ করেছেন এবং সিদ্ধ হয়েছেন। তিনিই পূর্ণ মানব। এ কোন্‌ পূর্ণতা? এ পূর্ণতা আসে ঈশ্বরপ্রেম থেকে, অন্য কোন সম্পদ নয়, কোন বিভূতি নয়, জীবনের অন্য কোন ক্ষেত্রেই নয়, একমাত্র দিব্যপ্রেমের প্রসঙ্গেই এই পূর্ণতা।
এ পূর্ণতার অর্থ সমস্ত সীমার ঊর্ধ্বে যাওয়া। ঈশ্বরের প্রতি এ সীমাহীন ভালোবাসা। ঈশ্বর যেমন অসীম, তাঁর প্রেমও তেমনি অসীম। এই-ই সিদ্ধি শব্দের অর্থ।
দ্বিতীয় লক্ষণ ছিল, ‘অমৃতঃ ভবতি’, তিনি অমরত্ব লাভ করেন। সাধারনভাবে অমরত্বের অর্থ অনন্তকাল এই শরীরে বেঁচে থাকা। স্পষ্টত তা অসম্ভব। এ অমরত্বের অর্থ এই নয় যে এই যে আমাদের দেহ, যাকে আমরা বাঁচিয়ে রাখতে চাই, তা একটা স্থায়িত্ব লাভ করবে। আজ যেমন আছি চিরকাল তেমনই থাকব, একেই আমরা ভাবি অমর হওয়া। আর এই পাঞ্চভৌতিক দেহে যদি তা সম্ভব না-ও হয়, সুক্ষ্মদেহে থাকব এবং স্বর্গবাসী অমর দেবতা বা দেবদূতের মতো আমরাও অমরত্ব উপভোগ করব।
কিন্তু এ অমরত্ব তো কল্পনা, উপকথা মাত্র। ভক্ত এ অমরত্ব চান না। তাঁর দেহের প্রতি সব আসক্তি দূর হয়েছে আর সেই সংগে দূর হয়েছে মৃত্যু ভয়ও। আসলে, মৃত্যুটা কি? মৃত্যু হচ্ছে এই দেহ-ইন্দ্রিয়, আমাদের এই সাধারণ পরিচিত অহং-এর থেকে বিচ্ছেদন-বিমুক্তি। দেহেন্দ্রিয় ও অহং-এর সঙ্গে সম্বন্ধ না থাকাই মৃত্যু।
যখন জগতের সমস্ত বস্তুর প্রতিই সম্পূর্ণভাবে আসক্তি চলে যায় তখনই ভক্ত অমরত্ব লাভ করেনকোন নশ্বর বস্তুর মূল্য তাঁর কাছে না থাকায় তিনিও হয়ে যান অবিনশ্বর। মরণের ভয় আর তাঁর থাকে না। দৈহিকভাবে অমর না হলেও তিনি তখনও নিজেকে জানেন সেই শুদ্ধ আত্মস্বরূপ রূপে। এমন কোন বস্তু আর তাঁর থাকে না যার প্রতি তার সামান্যতম স্পৃহা বা আসক্তি আসতে পারে, যা তাঁকে অপবিত্র করতে পারে, গণ্ডিবদ্ধ করতে পারে অথবা মনে হয় যেন তার দ্বারা তিনি কিছুটা সঙ্কীর্ণ হয়েছেন বা তাঁর সামান্য অধোগতি হয়েছে। জীবনের আসক্তির দিকটা সম্পূর্ণ-বিলুপ্ত হওয়ার জন্যই তিনি আজ অমৃত।
শ্রীরামকৃষ্ণ একবার স্বামীজীকে (তখন নরেন্দ্র) বলেন, “মনে কর যে এক খুলি রস আছে আর তুই মাছি হয়েছিস; তুই কোনখানে বসে রস খাবি? নরেন্দ্র বললে, আড়ায় বসে মুখ বাড়িয়ে খাব। আমি বললুম, কেন? মাঝখানে গিয়ে ডুবে খেলে কি দোষ? নরেন্দ্র বললে, তাহলে যে রসে জড়িয়ে মরে যাব। তখন আমি বললুম, বাবা সচ্চিদানন্দ-রস তা নয়, এ-রস অমৃতরস, এতে ডুবলে মানুষ মরে না; অমর হয়।” (শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণকথামৃত)। ভক্তি অমৃতস্বরূপ। তাই সে অমৃত যে পান করে সেও অমৃত হয়। কারণ একবার এই প্রেমভক্তির স্বাদ যে পেয়েছে সে তা জীবনভোর আস্বাদন করে। তার কাছ থেকে সে প্রেম কখনও ফিরিয়ে নেওয়া যায় না। কেন না প্রেম ও প্রেমিক তখন অবিচ্ছেদ্য হয়ে যায়। প্রেম তার জীবনেরই অঙ্গ, সে যতদিন থাকবে তার হৃদয়ে প্রেমও থাকবে।
এ কথাটা নানাভাবে ব্যাখ্যা করা যায়। প্রথমত, যা আমাদের প্রয়াসলব্ধ কর্মের মধ্য দিয়ে আমরা লাভ করি, তা বিনাশধর্মী। এ সম্পর্কে উপনিষদে একটি দৃষ্টান্ত আছে। এক কৃষক  কিছু বীজ বপন করল, কালে তার থেকে ফসল উৎপন্ন হল। যা উৎপন্ন হলো সংসারের কাজে ব্যবহার করতে করতে একদিন সব শেষ হয়ে গেল। এর তাৎপর্য যা উৎপন্ন বস্তু, যা আমাদের কর্মফল তা ক্ষণস্থায়ী, তা নিঃশেষিত হতে বাধ্য কিন্তু প্রেম ক্রিয়াসাধ্য নয়, কর্মফলও নয় প্রয়াস প্রযত্নের দ্বারা প্রেম হয় না সুতরাং হৃদয়ে একবার প্রেমের উদয় হলেই আর ক্ষয় নেই প্রেম আমাদের হৃদয় থেকে সব অশুদ্ধ ভাব দূর করে দেয়, বহুজন্মসঞ্চিত যেসব সংস্কার প্রেমের পথে বাধা সৃষ্টি করে আছে তাদের সরিয়ে দেয় কিন্তু স্বয়ং কোন কর্মের দ্বারা উৎপন্ন হয় না এই অপবিত্র ভাব এবং অসম্পূর্ণতা দূর হলে স্বতই প্রেমের প্রকাশ ঘটে প্রেম কিছুর পরিণাম নয়, তা নিত্য বর্তমান কেবল আমরা তার স্বাদ জানি না উৎপন্ন নয় বলে তার ক্ষয়ও নেই, তা অবিনাশী
আমাদের ভাল লাগার বা ভালবাসার এমন কোন ইন্দ্রিয়ভোগ্য বিষয়ই থাকতে পারে না  যার চিরস্থায়ী প্রভাব পড়তে পারে আমাদের উপর। যখনই সে বস্তু আমাদের ইন্দ্রিয়ের অগোচরে চলে যায়, ভাল লাগার অনুভুতিও আর থাকে না। যেমন মিষ্টি খেতে ভালবাসি, যতক্ষণ খাচ্ছি বেশ লাগছে, কিন্তু সে ভাল লাগাটা একটা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যেই শেষ হয়ে যাচ্ছে। যতক্ষণ খাদ্যবস্তুটির সঙ্গে রসনেন্দ্রিয়ের সংস্পর্শ থাকছে এই ভাল লাগার অনুভূতিও ততক্ষণ পর্যন্তই। এর একটি যেই থাকবে না অনুভূতিও থাকবে না।
কিন্তু দিব্যপ্রেম তা নয়। এর সঙ্গে কোন বহির্বস্তুর সংস্পর্শও নেই বলেই এর সমাপ্তিও নেই। এটি সদাবিদ্যমান, এ আমাদের সত্তাস্বরূপ। আমার ‘আমি’র মতো এ প্রেমও আমার মধ্যে একাত্ম হয়ে নিত্য বর্তমান, কারণ আমিই সেই প্রেমস্বরূপ। শাস্ত্র বলেছেন, সেই পরমানন্দ লাভ থেকেই এই জগতের উদ্ভব, আনন্দেই এর স্থিতি আর সেই আনন্দেই এর লয়।
“আনন্দাদ্ধ্যেব খল্বিমানি ভূতানি জায়ন্তে। আনন্দেন জাতানি জীবন্তি। আনন্দং প্রয়ন্ত্যভিসংবিশন্তীতি” (তৈ, উ ৩|৬)। এই আনন্দই ব্রক্ষ্ম আর এই-ই দিব্যপ্রেম। এই আনন্দই সৎ ও আমার সত্তা। কিন্তু বিচ্যুত না হলেও মন নানা বিষয়ে জড়িত থাকে বলেই সে আনন্দকে আমরা বিস্মৃত হয়ে থাকি। কিন্তু গভীর নিদ্রার সময় যখন আমরা নিজেদের অস্তিত্বকে মনে রাখতে পারি না তখন কি সে অস্তিত্বের বিলয় ঘটে? তা তো নয়। কারণ লয়ই যদি হতো তবে তা ‘আমি’-র ধারাবাহিকত্ব বিনষ্ট হতো। কিন্তু যে আমি জাগ্রত অবস্থায় সব ভোগ করছি, সেই আমিই তো স্বপ্ন দেখছি এই কথা বলি। আবার সেই ‘আমি’-ই সুষুপ্তি থেকে জেগে উঠে বলি ‘আমার’ তখন কন বিষয়েরই অনুভব ছিল না।
নিজের আমিত্বের  বিলুপ্তি কেউই অনুভব করতে পারে না। সেটা অনুভব করার জন্য সাক্ষী বা অনুভোক্তার প্রয়োজন। তাই সুষুপ্তি বিলয় নয়, চিত্তের একটা স্থিতি মাত্র। ব্যাপারটা এই জাগ্রত, স্বপ্ন, সুষুপ্তি প্রতিটি অবস্থাতেই কিছু প্রতিবন্ধক থাকে। সেই প্রতিবন্ধকটি সরিয়ে ফেলতে পারলে যা থাকে সেই আমিই সত্যিকার আমি – সেই-ই আত্মা, সেই নিত্য প্রেমস্বরূপ। এই-ই হল দার্শলিক সিদ্ধান্ত। এইভাবে দেখলে বোঝা যায় এ প্রেম কোন আগন্তুক ভাব নয়, এ অনুভবকারীরই সত্তা। এটিই অতি প্রয়োজনীয় তত্ত্ব। প্রেম যে অমৃতস্বরূপ এই তৃতীয় সূত্র থেকেই এই নিহিতার্থটি আমাদের অনুভব করতে হবে।
জীবনে একবার যদি এই প্রেম আস্বাদন হয় তবে জগতের সমস্ত কাম্যবস্তু তুচ্ছ হয়ে যায়। সমস্ত আনন্দনুভবকে ছাড়িয়ে যায় এই পরমানন্দের অনুভূতি। এ প্রেম অসীম অনন্ত, কোন কিছুর দ্বারা এর আর হ্রাসও পায় না আর বৃদ্ধিও হয় না।
তৃতীয় লক্ষণ ছিল, ‘তৃপ্তো ভবতি’। ভক্ত তৃপ্ত হয়। তৃপ্তির অর্থ কি? না তিনি সর্ব বাসনা থেকে মুক্ত হন। আগে বলেছেন ভক্ত অমৃত হন। তারই এটি অনুসিদ্ধান্ত যে তাঁর আর কোন কামনা-বাসনা থাকে না। সন্তোষ শব্দের এই অর্থ। আমাদের কোন একটা বিশেষ খাদ্যবস্তুর প্রতি যদি আকাঙ্ক্ষা থাকে সেটি খেয়ে বলি তৃপ্তি পেলাম। অর্থাৎ কোন বস্তু পাবার ইচ্ছা পূর্ণ হওয়াই তৃপ্ত হওয়া। ইচ্ছেটা তখন মিলিয়ে যায়। ‘তৃপ্তো ভবতি’, এই বাক্যাংশে সেই কথারই প্রতিধ্বনি, সব ইচ্ছা নিঃশেষিত হয়ে মিলিয়ে গেল।
যতক্ষণ বাসনা থাকে ততক্ষণ তৃপ্তি বা সন্তুষ্টি আসতে পারে না। ধন, সম্পদ, মান, ঐশ্বর্য যে বিষয়েই হোক বাসনা থাকা পর্যন্ত আমরা অতৃপ্তি বোধ করি। যখন কারও ঈশ্বরের প্রতি এই প্রেম হয় তখন তাই সে পরিতৃপ্ত, কারণ অন্য কিছু পাবার আকাঙ্ক্ষা তার আর থাকে না। গীতায় বলেছেন, “যং লব্ধা চাপরং লাভং মন্যতে নাধিকং ততঃ।” (৬|২২) অর্থাৎ যাকে পাবার পর অন্য কোন লক্ষ্য বস্তুকেই তার থেকে শ্রেষ্ঠ মনে হয় না। এই হলো তৃপ্ত শব্দের তাৎপর্য। দৈনন্দিন জীবনে হয়তো একটা বস্তু পেয়ে আমি তৃপ্ত হতে পারি কিন্তু অপর কোন বস্তুকে ঘিরে আমার অতৃপ্তি থাকে। বাসনার শেষ নেই। কিন্তু এই পরমপ্রেমের যিনি অধিকারি তাঁর আর অন্য কন বস্তু পাবার আকাঙ্ক্ষাই থাকে না। তাই তৃপ্তিও ব্যাহত হয় না। সেইজন্যই বলছেন ভক্ত ‘তৃপ্তো ভবতি’। এইভাবে ভক্তের তিনটি বৈশিষ্ট্য আমরা পেলাম। প্রথমত ‘সিদ্ধো ভবতি’, তারপর ‘অমৃতো ভবতি’ এবং শেষে ‘তৃপ্তো ভবতি’। প্রথমে পূর্ণতা তারপর নিত্যত্ব অর্থাৎ এ পূর্ণতা যেন ক্ষণস্থায়ী না হয়। কিন্তু অমৃত হয়েও আমার মধ্যে অতৃপ্তি থাকতে পারে, তাই সর্বশেষ লক্ষণ পরিতৃপ্তি – সর্বতোতৃপ্তি। এইভাবে ভক্তি ভক্তকে পূর্ণ করে – অমৃত কর, তৃপ্ত করে।
যখন আমরা কোন দেবমানবের সংস্পর্শে আসি তাঁর মধ্যে কি দেখি? দেখি তিনি পূর্ণকাম, তিনি অমৃত অর্থাৎ সর্বোতভাবে অনাসক্ত এবং তিনি সদাপ্রসন্ন। যাঁর হৃদয়ে ভক্তি প্রতিষ্ঠিত, যিনি বিগলিতচিত্ত, এ তিনটী বৈশিষ্ট্য তাঁর থাকবেই। কিন্তু সাধারণের অকাঙ্ক্ষিত সেই কতকগুলি অলৌকিক ক্ষমতা বা যা কখনই প্রকৃত সুখ দিতে পারে না এমন হাজারও ইচ্ছা পূরণের শক্তির জন্য প্রকৃত ভক্তের কোন আগ্রহই থাকতে পারে না।  



(স্বামী ভূতেশানন্দজী কৃত অনুবাদ ও ব্যাখ্যা)
=========================================================================
 

No comments:

Post a Comment