অমৃতস্বরূপা চ ||৩||
এবং এটি অমৃতস্বরূপও।
=====================================================================================
অর্থঃ এই ভক্তি অমৃতস্বরূপা, অবিনাশী
অর্থাৎ পার্থিব ভালবাসার মতো পরিবর্তনীয় নয়, অপরিবর্তনীয়, অবিনশ্বর।
ব্যাখ্যাঃ আমরা দুটি সূত্র আলোচনা করেছি। প্রথমটি ছিল বিষয়বস্তুর
পরিচিতি, উপক্রমণীকা, দ্বিতীয়টি ভক্তির সংজ্ঞা নির্ণায়ক। এই সংজ্ঞা প্রসঙ্গেই তৃতীয়
সূত্রে ভক্তির আরও বিস্তারিত ব্যাখ্যা করেছেন। আগে বলা হয়েছে ভক্তি প্রেমের
পরাকাষ্ঠা, ঈশ্বরের প্রতি পরম প্রেমস্বরূপা। এখানে বলছেন, এই ভক্তি হচ্ছে এমনই
প্রেম যার ক্ষয় নেই, বিনাশুও নেই, যা অমৃতস্বরূপা।
প্রেম শব্দটির ব্যঞ্জনা
অতি ব্যাপক। আমরা সাধারণভাবে প্রেমের অর্থ একরকম ভাবে বুঝি, কিন্তু যাঁরা সেই
দিব্যপ্রেম অনুভব করেছেন তাঁদের কাছে প্রেমের সংজ্ঞা অন্য। একই শব্দ কিন্তু তার তাৎপর্য
একেবারে ভিন্ন। কেন ভিন্ন? কারণ, সে দিব্য প্রেম আমাদের অনুভূতির অগোচর। দেহ ও
ইন্দ্রিয়ের অপভোগেই আমাদের প্রেম সীমাবদ্ধ কিন্তু দেহেন্দ্রিয়াতীত বলে দিব্য প্রেম
এক অনন্য আস্বাদন। দুটি প্রেমের ধর্ম ভিন্ন হলেও একই শব্দ ব্যবহার করা ভিন্ন
আমাদের অন্য কোন উপায় নেই, নেই এর অন্য কোন প্রতিশব্দ।
দিব্যপ্রেমে যে
আনন্দানুভূতির প্রকাশ সাধারণ পার্থিব প্রেমের বাহ্য প্রকাশও অনেকটা তারই অনুরূপ।
বলা চলে এও সেই পরম প্রেমেরই এক বিভঙ্গ, কিন্তু দুয়ের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে
অতলান্ত। সেইজন্য এই পৃথকীকরণের প্রয়াসেই বলা হয়েছে ঈশ্বরের প্রতি যে প্রেম তা হল
অমৃতস্বরূপ।
ভক্তি কেবল পরম প্রেম নয়,
অমৃতপ্রেম। এ প্রেম অমর্ত ও অমর অর্থাৎ এ প্রেমের শেষ নেই। পার্থিব প্রেমের আদি ও
অন্ত আছে, কিন্তু ঈশ্বরপ্রেম একবার হলে তার বিরতিও নেই, শেষও নেই। জাগতিক ভালবাসায়
প্রতিনিয়ত সচেতনতা থাকতে পারে না বা তা নির্বাধও হয় না, হওয়া সম্ভবও নয়। কেন না
এখানে যে ভালবাসছে এবং যাকে ভালবাসছে দুজনেই দেশকাল পাত্রের সীমাবদ্ধ গণ্ডির মধ্যে
অবস্থিত। তাই এ প্রেম ক্ষণিক। আমাদের অনুভবগম্য প্রেমের সঙ্গে দিব্য প্রেমের
এখানেই মস্ত বড় পার্থক্য। এ প্রেম কখনও অসীম হতে পারে না কিন্তু ঈশ্বর অনন্ত তাঁর
প্রতি প্রেমেরও সীমা পরিসীমা নেই। তীব্রতা, স্থায়িত্ব ও গুণগত মান সবদিক থেকেই এ
প্রেম দিব্য প্রেম। জাগতিক যে প্রেমের স্বরূপের সঙ্গে আমাদের পরিচয় তার থেকে
সম্পূর্ণ ভিন্ন। এই শুদ্ধ প্রেম বা শুদ্ধা ভক্তি কোন বহিরঙ্গ পরিবেশের উপর
নির্ভরশীল নয়। জগতে আমরা কোন ব্যাক্তি বা বস্তুর সংস্পর্শে এলে তখন আমাদের প্রেম
বা ভালবাসা জাগে, কামনার উদ্ভব হয় কিন্তু দিব্যপ্রেমে কোন বহিরাগত বস্তুর অপেক্ষা
নেই, কারণ সে ভালবাসাও আমার অন্তরের বস্তু আর যাঁকে ভালবাসছি সেই প্রেমাস্পদের
অধিষ্ঠান অন্তরেই। এ প্রেমে আস্বাদক ও আস্বাদ্য পৃথক নয়। প্রেমের পাত্র প্রেমিকের
সঙ্গে অভিন্ন। আমরা বলি ঈশ্বরের প্রতি ভালবাসা, কিন্তু সেই ঈশ্বর তো আমার বাইরে
নন, তিনি যে আমারই অন্তরতম সত্তা।
ভক্ত সেই পুরুষোত্তম থেকে
কখনও নিজেকে ভিন্ন মনে করেন না। তাঁর একটা দ্বৈত অনুভূতি থাকে, কিন্তু দ্বৈত বলতে
আমরা জাগতিক বুদ্ধিতে যা বুঝি তা ঠিক সে ধরনের নয়। এখানে ভালবাসার পাত্র অসীম
অনন্ত শাশ্বত পুরুষ আর তাঁর প্রতি প্রেমও অসীম। সেইজন্য একে পরমপ্রেম বলা হয়েছে।
এই পরম প্রেমের অন্ত হয় না বলেই তা অমৃতস্বরূপ হতে বাধ্য। এখানে ‘চ’ শব্দটির প্রয়োগের
দ্বারা ঋষি বোঝাতে চাইছেন যে এটি পূর্বতন সূত্রেরই অনুষঙ্গ, পৃথক কোন সংজ্ঞা নয়।
এতক্ষণের আলোচনায় আমরা
দেখলাম কেন ঈশ্বরের প্রতি প্রেমকে পরম প্রেমস্বরূপ ও অমৃতস্বরূপ বলা হয়েছে। একে
পরম প্রেম না বলে পরম প্রেমের স্বরূপ বলা হয়েছে। যদি পরমপ্রেম বলা হতো তাহলে যে
জাগতিক প্রেমের সঙ্গে আমরা পরিচিত তাকেই বোঝাত। কিন্তু ‘স্বরূপ’ কথাটির প্রয়োগের
দ্বারা ইঙ্গিত করা হলো যে আমাদের পরিচিত যে প্রেমানুভব সেটি এখানে দৃষ্টান্তস্বরূপ
নেওয়া হয়েছে। আমাদের জাগতিক ভালবাসা আর ঈশ্বরের প্রতি ভালবাসা ঠিক এক নয়, একটা
সাদৃশ্য আছে এই মাত্র। বৈসাদৃশ্য অনেক আছে সেগুলি ক্রমশ আলোচনা করব। এখন কেবলমাত্র
এটাই বুঝবার যে পার্থিব সম্পর্ককে যে সব ক্ষেত্রে মহত্তম অনুভূতি হয়, দিব্যপ্রেম
তার স্বরূপ হলেও তাকে ছাপিয়ে যায়। প্রথমে এই জগতে সাধারণভাবে প্রেম বলতে কি বোঝায়
ও তারপর সেই প্রেমের পরাকাষ্ঠা কাকে বলে তা বলা হলো। তারপুর বলছেন, এ প্রেমের
লক্ষ্যবস্তু ঈশ্বর।
এইভাবে ভক্তির সংজ্ঞাটির প্রথমার্ধে
ভক্তি কি সে কথা বলে দ্বিতীয়ার্ধে অপর বৈশিষ্ট্য বলছেন অমৃতস্বরূপত্ত্ব। জগতের যে
কোন ভালবাসাতেই একদিন ছেদ পড়বেই। ভালবাসায় হয় ভালবাসার ব্যক্তি বা বস্তু চলে যায়
নয়তো যিনি ভালবাসেন তিনি থাকেন না। প্রেমিক বা প্রেমাস্পদ একজনের জীবনাবসান হয়।
অথবা প্রেমিক ও প্রেমাস্পদের মধ্যে এমন কোন অবস্থার উদ্ভব হতে পারে যার ফলে উভয়ের
সম্পর্ক ক্ষুন্ন হয়। তাই তিনটি কারণের যুগপৎ সমাবেশ ঘটলে তবেই প্রেম অমর হতে পারে।
প্রথমত, ভালবাসার পাত্র যেখানে অমর বা অব্যয় – এখানে স্বয়ং পরমেশ্বর। দ্বিতীয়ত,
যিনি ভালবাসছেন সেই আমি বা ভক্ত – তিনিও অমর, নিত্য, কারণ তিনি ভগবানেরই অংশ। এবং
তৃতীয়ত, এই ভালবাসা কোন বহির্বিষয়ের উপর নির্ভর করে না, যার ফলে ভক্ত আর ভগবানের
সম্পর্কে কোন বাধা বা বিচ্ছেদের সম্ভাবনা থাকে না। তাই এই ভক্তি অমৃতস্বরূপা।
এখানে প্রেম, প্রেমিক এবং প্রেমাস্পদ তিনটিই নিত্য।
জাগতিক প্রেমের সঙ্গে
ঈশ্বরপ্রেমের অনেক সাদৃশ্য আছে। সাদৃশ্য আছে সুখ, আনন্দ বা উল্লাসবোধ। কিন্তু
বৈসাদৃশ্যও অনেক। প্রথমত, পার্থিব প্রেম ক্ষণস্থায়ী, বিনাশশীল। দ্বিতীয়ত, এ প্রেম
যত সুগভীরই হোক, সেই ভূমিতে কখনই পৌছাতে পারে না যেখানে প্রেমিক নিজেকেও ভুলে যায়
এবং তৃতীয়ত, এই ভালবাসা নশ্বর বস্তুর প্রতি, কোন নিত্য বস্তু সম্বন্ধে নয়। কিন্তু
ঈশ্বরের প্রতি প্রেমে এই তিনটি অবগুণের একটিও নেই। এই জন্যই তা দিব্যপ্রেম এবং তাই
ভক্তির সংজ্ঞা নিরূপণ করা হয়েছে – ভক্তি হল ঈশ্বরের প্রতি প্রেমস্বরূপা ও
অমৃতস্বরূপা।
আমরা প্রায়ই শুনি, আমাদের
সাধারণ ভালবাসাকে মোড় ঘুরিয়ে যদি ঈশ্বরে দিই, তবে তাই-ই হবে দিব্যপ্রেম, সেটিই
ভক্তি। কিন্তু কথাটা ঠিক তা নয়। কারণ মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া কথাটার মধ্যে রয়েছে একটা
প্রয়াসের ব্যঞ্জনা, আমাদের সচেষ্টতা। কিন্তু ঈশ্বরের প্রতি অনুরাগ সে তো
স্বতঃস্ফুর্ত, তা অপরের কোন নির্দেশের অপেক্ষা রাখে না। সে তো আমাদের প্রাণের
বস্তু, আমার অস্তিত্ত্বেরই অংশ। এই বিষয়টি অত্যন্ত বৈশিষ্ট্যপূর্ণ। ভক্তির অর্থ এ
নয় যে আমরা চেষ্টা করে তাঁর দিকে মন দেব। একেবারে প্রবর্তক অবস্থায় ভক্তির
প্রাথমিক স্তরে একথা সত্যি হতে পারে কিন্তু ভক্তি যখন পরিণত হয় তখন তা বিধিনিষেধের
অতীত। মনের গতিকে তখন নিয়ন্ত্রণের প্রশ্ন থাকে না, মন সর্বক্ষণের জন্যই ঈশ্বরে স্থিত
থাকে। ভক্তিই ভক্তের সত্তা। তখন ভগবান-ভক্ত-ভক্তি এক অঙ্গে মিলে যায়। এই-ই হলো
প্রকৃত ভক্তির তাৎপর্য।
তাহলে প্রকৃত ভক্তি লাভ
হল কিনা কিভাবে জানা যাবে? পরবর্তী সূত্রে সেই কথাই বলেছেন, যে ভক্তি লাভ হলে জীব
সিদ্ধ বা পূর্ণ, অমৃত বা অমর হয় এবং তৃপ্ত, সর্বোতভাবে সন্তুষ্ট হয়। এই প্রত্যেকটি
বিশেষণেরই গভীর অর্থ নিহিত রয়েছে।
(স্বামী ভূতেশানন্দজী কৃত অনুবাদ
ও ব্যাখ্যা)
=====================================================================================
No comments:
Post a Comment