সা তস্মিন্ পরমপ্রেমরূপা ||২||
এই ভক্তি ঈশ্বরের প্রতি পরম প্রেমরূপা।
ব্যাখ্যাঃ ভক্তির স্বরূপ অবর্ণনীয়, তবু ভাষায় তা যতটা প্রকাশ করা সম্ভব তারই সংক্ষিপ্ততম সংজ্ঞা দেবর্ষি এখানে দিয়েছেন – ঈশ্বরের প্রতি পরম প্রেমই ভক্তি।
=====================================================================================
অর্থঃ ভগবানের প্রতি অপরিসীম ভালবাসাই হচ্ছে ভক্তি
ব্যাখ্যাঃ ভক্তির স্বরূপ অবর্ণনীয়, তবু ভাষায় তা যতটা প্রকাশ করা সম্ভব তারই সংক্ষিপ্ততম সংজ্ঞা দেবর্ষি এখানে দিয়েছেন – ঈশ্বরের প্রতি পরম প্রেমই ভক্তি।
কিন্তু সংজ্ঞাটি
সংক্ষিপ্ততম হলে কি হয়, এর ব্যঞ্জনা অতি নিগুঢ়। প্রথমেই বলা হচ্ছে প্রেম হবে পরম। ‘পরম’
এই বিশেষণটিই তথাকথিত সাধারণ ভালবাসার সঙ্গে এর এক বিরাট পার্থক্য সূচনা করছে। ‘পরম’
শব্দটি শুধু পরিমাণগত নয়, গুণগতও। এ ভালবাসা কেবল তীব্র বা গভীর নয়, সাধারণ লৌকিক
ভালবাসা থেকে এ গুণগত মান ভিন্ন। কি সেই পার্থক্য? ভালবাসার গুণগত শ্রেণীভেদ কি
করে হয়? উদাহরণস্বরূপ জাগতিক ভালবাসার কথা বলা যায়। সেখানে তো কত প্রকারভেদই দেখি।
সন্তানের প্রতি জননীর ভালবাসা, স্বামী-স্ত্রীর পরস্পরের প্রতি ভালবাসা, পিতা-মাতার
প্রতি, আত্মীয়-বন্ধুর প্রতি ভালবাসা কিংবা নাম-যশ-অর্থের প্রতি আকর্ষণ। এ সবই
ভালবাসা, কিন্তু এর কোনটিকেই ‘পরম’ বলা যাবে না।
তাহলে কোন্ বিশেষ গুণটি
এই সাধারণ ভালবাসাকে অসাধারণ করে তোলে? ‘পরম’ করে তোলে? সেটি হচ্ছে শুদ্ধ অহৈতুকী
ভালবাসা। সেই পরম প্রেম ব্যতীত অন্য সব
ভালবাসাই আত্মকেন্দ্রিক বা স্পষ্টভাষায় বলা যায় স্বার্থগন্ধযুক্ত ভালবাসা। হয়তো
একথায় অনেকেই আপত্তি করতে পারেন। তাঁরা সন্তানের প্রতি মায়ের বাৎসল্য বা
স্বামী-স্ত্রীর পরস্পরের প্রতি ভালবাসাকে বলবেন নিঃস্বার্থ ভালবাসার উদাহরণ। জগতে
এ ধরণের ভালবাসা দুর্লভ হলেও একেবারে নেই তা নয়, এই তাদের মত। কিন্তু আমরা বলব, না।
অন্তরের গভীরে সেখানেও এক স্বার্থবুদ্ধিই কাজ করে। কেন? না, ভালবাসার পাত্রটিকে
কেন্দ্র করেই তাঁদের এ ভালবাসা বিকীর্ণ হচ্ছে। মা শিশুকে ভালবাসছেন শিশু বলেই নয়,
বাসছেন তাঁরই শিশুসন্তান বলে। সুতরাং তাঁর ভালবাসাটি নিজেকেই কেন্দ্র করে আবর্তিত।
এইভাবেই সর্বত্রই দেখা যায় আপাত নিঃস্বার্থ সমস্ত ভালবাসারই কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে
একটা সুক্ষ্ম স্বার্থবোধ। সব ব্যাপারেই এসে পড়ছে ‘অহং’, আমি, আমাকে বা আমার বোধ।
এমনকি একটি শিশুও যে একটা পুতুল ভালবাসে তার কারণ সে জানে এটা তার ‘নিজের’ পুতুল।
এই রকম সব ভালবাসার ক্ষেত্রেই জড়িত আছে ‘আমার’ অধিকারবোধ। সেইজন্যই একে বলা হয়
স্বার্থপর ভালবাসা। একমাত্র ঈশ্বরের প্রতি ভালবাসাতেই কোন স্বার্থের সম্বন্ধ থাকে
না। তাঁকে যখন ভালবাসি তখন একবারও মনে হবে না যে তিনি একমাত্র আমারই দেবতা, অন্য
কারও নন। তাঁকে ভালবাসি তাঁকে ভালবাসা যায় বলেই। সুতরাং কোন অধিকারবোধ সেখানে কাজ
করে না। তাঁকে ভালবাসি তাঁকে ভালবাসা যায় বলেই। সুতরাং কোন অধিকারবোধ সেখানে কাজ
করে না। তাঁকে ভালবাসার সময়ে কখনও মনে হবে না যে তিনিই আমার একান্ত নিজস্ব সম্পদ।
তিনিই একমাত্র পরম প্রেমের বস্তু বলেই তাঁকে আমাদের সমস্ত ভালবাসা উজাড় করে দিতে
পারি। সেইজন্যই উপনিষদ্ বলছেন, ‘ন বা অরে সর্বস্য কামায় সর্বং প্রিয়ং
ভবত্যাত্মনস্তু কামায় সর্বং প্রিয়ং ভবতি।’ (বৃহঃ উঃ, ২|৪|৫)
ঈশ্বর আমাদের কাছে প্রিয়
কেন? তিনি ঈশ্বর বলেই। এর সঙ্গে অন্য কোন স্বার্থকেন্দ্রিক সম্বন্ধ নেই বলেই। এই
নিঃস্বার্থতার জন্যই এই প্রেম পরম, গুণগত ও পরিমাণগত উভয় দিক থেকেই। পরিমাণগত
এইজন্য যে অন্য কোন পার্থিব ভালবাসা এত তীব্র হয় না, যা নিজের অস্তিত্ত্বকে ভুলিয়ে
দিতে পারে।
সেদিক দিয়ে সন্তানের
প্রতি মায়ের ভালবাসাকেও কি আমরা নিঃস্বার্থ বলতে পারি না। হ্যাঁ, পারি কতকটা
পরিমাণে। হয়তো সমস্ত পার্থিব সম্পর্কের মধ্যে নিঃস্বার্থ ভালবাসার এটি কথঞ্চিৎ
শ্রেষ্ঠ উদাহরণ। যখন শিসু খুবই ছোট্ট থাকে, অন্তত সেই সময়টা তার মায়ের কাছে কোন
প্রত্যাশা থাকে না। কিন্তু যতই সে বড় হতে থাকে, সমাজ সংসারের সে একজন সদস্য হয়ে
ওঠে, তখন মা-ও কিছু প্রতিদান আশা করেন। তবু সেক্ষেত্রেও এ ভালবাসাকে আমরা সম্পূর্ণ
স্বার্থলেশহীন বলতে পারি না কারণ সেই আমিত্ববোধ, অধিকারবোধ সেখানে নিভৃতে কাজ করে।
এ সন্তান তাঁর সন্তান এই বুদ্ধিই তাঁর ভালবাসার মূলে। অন্যভাবে বলা যায় শিশু তো
মায়েরই প্রতিরূপ, তাই তাকে ভালবাসা বিজেকে ভালবাসারই এক রূপান্তরমাত্র। তিনি
নিজেকে ভালবাসেন তাই সন্তানটিকেও ভালবাসেন, সেজন্য সেটি হয়ে যায় স্বার্থযুক্ত।
জগতের সমস্ত সম্বন্ধের ক্ষেত্রে এই একই নীতি বা স্বার্থ কাজ করছে, ভালবাসার সঙ্গে
মিশে আছে আত্মরতি। কথাটা হয়তো শুনতে রূঢ় বা কঠিন, অনেকেই শুনে বিচলিত বা হতাশ
হবেন, কিন্তু গভীর নিরপেক্ষ বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে কথাটা অপ্রিয় হলেও সত্য।
সংশয় জাগতে পারে এই
পার্থিব ভালবাসার সঙ্গে দিব্যপ্রেমের কি কোন সাদৃশ্য আছে? উত্তরটা নেতিবাচক। কারণ
ভগবানের জন্য যে কোন ভালবাসা তাতে কোন অধিকারবোধ, আমি বা আমার বোধ নেই, কোনও
চাওয়া-পাওয়া নেই। এই দিব্য প্রেমের দৃষ্টান্ত বৃন্দাবনের গোপীদের জীবন। সেখানে কি
দেখি? সেখানেও প্রথমে মনে হয় তাঁদের ‘আমার কৃষ্ণ’ এই বোধ কাজ করছে। হয়তো সে বোধ
আছে, কিন্তু তাঁরা তাদের ভালবাসার পাত্রকে একান্ত নিজের করে রাখেননি। জানতেন ভগবান
কেবল তাঁদের একার নন, তিনি সকলের। কৃষ্ণকে কেবলমাত্র নিজের বলেই ধরে রাখছেন, এ
মূঢ়তা তাদের ছিল না। ছিল তাঁকে ‘আমারই’ বলে সম্বোধন করবার একটা মাধুর্যের আবরণ মাত্র।
এই আমার বোধ আত্মরতি নয়, ‘অহং’ বোধ নয় কেননা এখানে সকলেই জানে যে ভগবান কারও একার
প্রেমস্পদ নন।
তাহলে কি এটাই সত্যি যে
সব রকমের জাগতিক ভালবাসাই স্বার্থকেন্দ্রিক? যদি তাই হয় তবে জাগতিক ভালবাসাকে আমরা
কোন উচ্চমূল্য দিতে পারি না। একথা একদিক থেকে ঠিকই যে জাগতিক ভালবাসা যদি
নিঃস্বার্থ হয় তবে তাকে ভালবাসা আখ্যাই দেওয়া যায় না। যদি কাউকে একান্তই আমার বলে
না-ই ভাবি, তবে ভালবাসা মুখের কথা মাত্র। সেখানে কোন মমত্ববোধ, কোন গভীরতা থাকে
না। ভালবাসা যত গভীরতর হবে ভালবাসার পাত্র তত আপনতর হয়ে উঠবে। এটা খুব খাঁটি কথা,
কিন্তু অসুবিধা হচ্ছে আমরা এর উপরের সুক্ষ্ম আবরণটি সরিয়ে দেখতে পাচ্ছি না। এই
আবরণ বা মায়ার জালটি থাকার জন্যই আমরা এই লৌকিক ভালবাসাকেও মহৎ, শুদ্ধ, দিব্য কত
কি বলে থাকি। কিন্তু তলিয়ে বুঝতে কি কখনও চেষ্টা করি? করলে দেখব এক সঙ্কীর্ণ ‘মমত্ব’বোধ
ছাড়া পার্থিব ভালবাসার অস্তিত্ত্বই থাকতে পারে না।
এর থেকে আমরা একটা
অনুসিদ্ধান্তে পৌঁছই যে মা তাঁর সন্তানকে ভালবাসেন সন্তানের জন্যই নয়, সন্তানকে
ভালবেসে তিনি সুখ পান তাই। স্বামী-স্ত্রীর ভালবাসা বা অন্য যে কোন সম্পর্কের
ক্ষেত্রে এই একই কথা প্রযোজ্য। তাহলে ঈশ্বরের প্রতি ভালবাসার ক্ষেত্রে কি হয়?
তাঁকে ভালবাসার ক্ষেত্রেও তো আমরা তাঁকে ভালবাসি তাঁর জন্য নয়, নিজেরই আনন্দের
জন্য। না, সেকথা বলা যায় না এইজন্য যে সে সময় আমরা নিজেদের কথা মোটেই ভাবি না।
আমরা যখন তাঁকে আমাদের প্রেম নিবেদন করি তখন একবারও মনে হয় না যে তিনি বিনিময়ে
কিছু দিয়ে আমাদের খুশি করবেন। ঈশ্বর স্বয়ং প্রেমস্বরূপ তাই তাঁকে ভালবাসার
ক্ষেত্রে দৈবীভাবের একটা সংস্পর্শ সব সময়েই থেকে যায়। তাঁর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক
হলে আমরা বুঝতে পারব তিনিই একমাত্র ভালবাসার বস্তু। তিনি প্রেমস্বরূপ বলেই আমাদের
কাছে তিনি প্রিয়তম, একমাত্র প্রেমষ্পদ। তিনি প্রিয়, কেননা তিনি প্রীতিময়।
আরোও একটা বিষয় আছে যা
নিয়ে পরে আলোচনা করব তা হচ্ছে তাঁর মহত্ত্ব সম্বন্ধে সচেতনতা। কিছু মানুষ আছেন
যাঁরা হয়তো শাস্ত্র পড়েননি, ভক্তিপথের বিষয় কিছুওই জানেন না বা ঈশ্বরপ্রেম কথাটির
সঙ্গে পরিচিত নন, কিন্তু তাঁরাও তাঁদের ভালবাসার পাত্রটির কোন বিশেষ গুন আছে
একথাটি মনে মনে জানেন। তাই তাঁরাও যখন ঈশ্বরকে ভালবাসেন এটা বুঝতে পারেন যে জগতের
অন্য সব বস্তু থেকে ঈশ্বরের কোথাও একটি স্বাতন্ত্র্য আছে। এই বোধ, এই চেতনাই লৌকিক
প্রেম থেকে দিব্য প্রেমকে পৃথক করে।
কথাটা আরোও একভাবে বলা
যায়। নিজের জন্যই কোন ব্যক্তি বা বস্তুকে ভালবাসি একথা সত্যি হলে ঈশ্বরের
ক্ষেত্রেই বা তা প্রযোজ্য হবে না কেন? আমি আমার দেহকে ভালবাসি। কেন? না, এটা আমার
দেহ। তাই একটা কিছুর জন্যই ভালবাসা। দেহ অসুস্থ হোক সেটা আমি চাই না, কেননা তা
আমার কাছে প্রীতিপদ নয়। সুতরাং দেহ নয়, ভাললাগা বা ভালবাসা সবই এই আমাকে কেন্দ্র
করে। এই যে দেহের থেকে নিজেকে পৃথক করছি এর অর্থ কি? নিজেকে যখনই দেহ-মন-বুদ্ধি
বলে জানছি, শুদ্ধ আত্মা বলে জানছি না, তখন আর এ ভালবাসা শুদ্ধ থাকছে না। আরও একটু
গভীরে গিয়ে বলা যায়, এ দেহ আমার বলেই যে দেহটাকে ভালবাসছি তা নয়, আমি নিজেকেই ভালবাসছি।
দেহকে ভালবাসি, কারণ তার মধ্যে দিয়ে আনন্দ অনুভব করছি। দেহই হচ্ছে সেই যন্ত্র যার
মাধ্যমে ঘটে আমার ভোগবাসনার পরিতৃপ্তি। মন, ইন্দ্রিয় ও অন্যান্য বস্তুর ক্ষেত্রে
এই একই সূত্র প্রযোজ্য। অর্থাৎ আমার ‘আমি’-কেই আমি ভালবাসছি স্বতঃস্ফুর্তভাবে। সেই
আমি বা সেই আত্মার সঙ্গে যুক্ত বলেই অন্য যা কিছু বস্তু তা আমার কাছে প্রিয় হয়ে
ওঠে।
ঈশ্বর হচ্ছেন সেই
আত্মস্বরূপ – আমাদের সকলের আত্মা। সুতরাং নিজেকে ভালবাসা আর ভগবানকে ভালবাসা হতে
পারত সমর্থক। যখন দেহ-ইন্দ্রিয়াদি অনাত্মবস্তুকে আমরা আত্মা বলে ভ্রম করি ও তার
প্রতি আসক্ত হই, এই নিজেকে ভালবাসা তখন হয়ে পড়ে অশুদ্ধ ও সঙ্কীর্ণ। ঈশ্বরপ্রেম
দিব্য ও পবিত্র আর দ্বিতীয়টি মালিন্য ও দোষযুক্ত। কিন্তু আত্মাই ঈশ্বর এই বোধ
থাকলে সে ভালবাসাই তখন শুদ্ধ প্রেম।
লৌকিক প্রেম ও
ঈশ্বরপ্রেমের এই তুলনামূলক আলোচনার সার সংক্ষেপ এই যে, ভক্তি হলো ঈশ্বরের প্রতি
পরম প্রেমস্বরূপ। ভক্তির সংজ্ঞায় পরম প্রেম না বলে পরমপ্রেমরূপা কেন বলেছেন? বলছেন
এইজন্য যে পরম প্রেমকে মৌখিক ভাষায় বর্ণনা করা যায় না। কেন যায় না? না, যা
সম্পূর্ণ মৌলিক তা বর্ণনার অতীত। আমরা প্রগাঢ় ভালবাসা বুঝলেও পরম প্রেম কাকে বলে
জানি না, ওটি আমাদের অনুভূতির বাইরে। তাই বলছেন, ভক্তি হল পরম প্রেমের মতো বা পরম
প্রেমের স্বরূপ। এর বেশি ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়। তীব্র ভালবাসার মধ্যে এই
পরমপ্রেমের আভাসই মেলে মাত্র, কিন্তু দুটি এক নয়। প্রথমটি লৌকিক সুতরাং অশুদ্ধ
দ্বিতীয়টি শুদ্ধ। জাগতিক প্রেমের মাপকাঠিতে শুদ্ধ প্রেমের ধারনা করা অসম্ভব বলেই
ঋষি পরমপ্রেমকেই ভক্তি না বলে বলছেন, ভক্তি পরম প্রেমের স্বরূপ। প্রেম সম্বন্ধে
আমাদের সীমিত জ্ঞানের ঊর্ধ্বে এই পরম প্রেম – ভক্তি তারই রূপ বিশেষ।
‘পরম’ শব্দটি নিয়ে দীর্ঘ
আলোচনা করলাম, তবু আরও একটি কথা এখানে
বলবার আছে। এই প্রেম ঈশ্বরে অর্পিত হলে তবেই তা হবে ভক্তি। ঈশ্বর ব্যতীত অন্য কোন
বস্তুর প্রতি প্রবল অনুরাগ কিন্তু ভক্তি নয়, সেটি আসক্তি, সেটি আকর্ষণ মাত্র। ঈশ্বরই
ভক্তির একমাত্র সম্পদ। যখন আমরা গুরুর প্রতি বা অন্য কোন মহাপুরুষের প্রতি ভক্তির
কথা বলি তা হল ঈশ্বরেরই আর একটা বিশেষ রূপের প্রতি ভক্তি। কারণ গুরুকে বা প্রকৃত
কোন মহাত্মাকে ঈশ্বরের সঙ্গে সদা যুক্ত বা অভিন্ন বলেই তখন মনে করি। সুতরাং ঈশ্বর
এবং একমাত্র ঈশ্বরই আমাদের ভক্তির আধার, তাঁর প্রতি ভালবাসার পরাকাষ্ঠাই ভক্তি।
ভক্তির দ্বিতীয় পাত্র নেই – একজনি আছেন, তিনি ঈশ্বর – একমাত্র ঈশ্বর।
তবে কি আমরা এ জগতে অন্য
কাউকে ভালবাসব না? তা কখনই বলব না। আমরা ভাল সবাইকেই ভাসব, কিন্তু তাদের সঙ্গে
সম্বন্ধ হবে ঈশ্বরকে কেন্দ্র করে। ঈশ্বরই তাদের হৃদয়ে অবস্থিত – তারা ঈশ্বরেরই
প্রতিনিধি এই বোধ জাগ্রত থাকবে। ভক্তের হৃদয়ে ভগবান ছাড়া অন্য আর কিছুর স্থান নেই।
ইহুদী শাস্ত্রে ঈশ্বরকে বলা হয়েছে jealous বা
ঈর্ষাপরায়ণ। এর অর্থ হৃদয়মন্দিরে তিনি ছাড়া আর কারও কোন স্থান কোথায়? এইভাবে একমাত্র
তিনিই যখন হৃদয়েশ্বর হয়ে থাকবেন সেই অবস্থাতে বলা চলে ভক্তির উন্মেষ ঘটেছে।
ভক্তিমার্গ
সম্বন্ধে প্রধান কথা এই যে এর মধ্যে কোন স্বার্থবুদ্ধু জড়িত থাকা চলবে না। কোন
কিছু পাবার জন্য তাঁকে আরাধনা করা নয়। তিনি ‘তিনি’ বলেই, ঈশ্বর বলেই তাঁকে ভালবাসি। অন্য
কোন কিছুর জন্য নয়, তাঁর জন্য তাঁকে চাওয়া – লৌকিক কোন প্রত্যাশা, এমনকি সুখের
জন্যও নয়। শুধু তাঁকে পাওয়াই একমাত্র চাওয়া। নাম-যশ-ধন-সম্পদ অন্য কোণ কিছুই তাঁর
অনুগ্রহে পাবার আশা করব না। আর সেজন্য প্রয়োজন হলে দুঃখকেও সাদরে বরণ করে নিতে
হবে। যদি তার জন্য কোন অসন্তোষের সৃষ্টি হয় তো তাও বরণীয়। আমাদের ঈশ্বরের প্রতি
ভালবাসার পেছনে তিনি যে আমাদের কিছু দেবেন এ রকম কোন কারণ থাকবে না। ন্যুনতম
চাওয়াও নয়। এপথে চলতে চলতে সুখ-শান্তি-আনন্দ হয়তো অনেক কিছুই আপনা থেকেই আসতে
পারে, কিন্তু আমাদের যেন তার জন্য কন আকাঙ্খা না থাকে। এমনকি মোক্ষের কথা,
জন্ম-মৃত্যুর পারে যাবার কথাও আমাদের ভাবনায় থাকবে না। যেখানে গভীর ভালবাসা সেখানে
মুক্তির আকাঙ্খাও অবান্তর।
তাই যদি হয়, কিছু যদি না পাবারই থাকে, তবে তাঁকে
আমরা ভালবাসব কেন? প্রশ্নকর্তার এ প্রশ্নটা তাকেই ফিরিয়ে দিয়ে বলতে পারি, আমরা
নিজেদের কেন ভালবাসি? ভাল না বেসে যে আমরা পারি না, ওটা স্বতই উৎসারিত হয়। ভক্তের
ক্ষেত্রেও একই উত্তর। তিনি ইশ্বরকে যে না ভালবেসে পারেন না। ঈশ্বরই যে তাঁর
একমাত্র ভালবাসার পাত্র। ঈশ্বর তাঁকে ভালবাসবেন এই প্রত্যাশায় ভক্ত ভগবানকে
ভালবাসেন না। ভক্তের নিজেকে উজাড় করে দেওয়াতেই আনন্দ, পাবার কোন আকুলতা নেই।
অমরত্বলাভ, ভববন্ধন থেকে মুক্তি এসব প্রত্যাশা ভক্তির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট, সন্দেহ
নেই, কিন্তু এগুলি ভক্তির নিম্নস্তরের কথা। শুদ্ধাভক্তির সংজ্ঞায় এইসব
কামনা-বাসনার স্থান নেই, নেই সামান্যতম প্রত্যাশা।
শেষ প্রশ্ন, এই অপার্থিব প্রেম কি আমাদের পক্ষে
সম্ভব? অবশ্যই সম্ভব যদিও অধিকারির সংখ্যা হয়তো মুষ্টিমেয়। ভক্তির এই পরাকাষ্ঠায় উন্নীত
হতে পারেন অতি দুর্লভ ভাগ্যবান কোন কোন ভক্ত। কিন্তু যে যেখানে আছেন সেখান থেকে
যাত্রা শুরু করার তো কোন বাধা নেই। প্রথমদিকে হয়তো স্বার্থবুদ্ধিও থাকতে পারে,
তাতেও ক্ষতি নেই। এই পথ ধরে নিষ্ঠাভরে চলতে চলতে তাও ধীরে ধীরে অপসারিত হবে, আমরা
উচ্চ থেকে উচ্চতর স্তরে উঠব ও ভক্তির সংজ্ঞায় যে লক্ষ্যের কথা বলা হয়েছে সেই
লক্ষ্যে একদিন পৌঁছব।
(স্বামী
ভূতেশানন্দজী কৃত অনুবাদ ও ব্যাখ্যা)
=====================================================================================
পূজনীয় মহারাজএর লেখা শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণ কথামৃত প্রসঙ্গ বই গুলি এই ফরম্যাটে প্রকাশ করার জন্য অনুরোধ করছি।
ReplyDeleteঅসিত সাহা নমষ্কার।