অথাতো ভক্তিং ব্যাখ্যাস্যামঃ ||১||
এখন আমরা ভক্তির ব্যাখ্যা করব।
=========================================================================
অর্থঃ এরপর এইজন্য ভগদ্ভক্তির বিষয় বর্ণনা করব।
ব্যাখ্যাঃ ‘এখন ভক্তিতত্ত্ব ব্যাখ্যা করব’ এই সূত্রটি প্রথমে
বলে দেবর্ষি নারদ তাঁর আলোচনা আরম্ভ করছেন।
ভক্তিতত্ত্ব সম্বন্ধে জানবার
অধিকারি এক বিশেষ শ্রোতৃবর্গকে উদ্দেশ্য করেই তিনি ভক্তিসূত্র রচনা করেছেন। যে কোন
বিদ্যা তাকেই দান করা চলে যার সেই বিদ্যা গ্রহণের ও ধারণার যোগ্যতা বা সামর্থ্য
আছে। সকলকেই সব বিদ্যা নির্বিচারে দান করা সঙ্গত নয়, কারণ তা তাদের সাহায্য তো করেই না,
উপরন্তু দেখা যায় অযোগ্য অনিচ্ছুক ব্যক্তি গুরুকেই হয়তো উপহাস করছে।
এই কারণেই বিদ্যাদানের পূর্বে বিদ্যার্থীর যোগ্যতা যাচাই বা অধিকারি নির্বাচন
আবশ্যক। প্রায় সব সূত্রগ্রন্থেই এই একই রীতি অনুসৃত হয়েছে।
প্রথম সূত্রের মধ্যে দেখা যাবে
চারটি বিশেষ অর্থ নিহিত আছেঃ
১) বিষয় –
শিক্ষণীয় বিষয়বস্তু
২) অধিকারি –
কাদের জন্য এই বিদ্যা অথবা এই বিষয়ে শিক্ষালাভের যোগ্যতা কার আছে?
৩) উপযোগিতা –
ভক্তির উদ্দেশ্য বা অভীপ্সিত লক্ষ্য কি? অথবা
ভক্তিমার্গ শিক্ষার বা অনুসরণের প্রয়োজন কি?
৪) সম্বন্ধ –
ভক্তির যা উদ্দেশ্য তা লাভ করবার জন্য এই যে পথের কথা বলা হবে তাদের
পারস্পরিক সম্বন্ধ কি? এই পথ অনুসরণে কি অভীষ্ট সিদ্ধ হবে?
ভক্তিতত্ত্ব সম্বন্ধে বিস্তৃত
আলোচনায় প্রবেশ করার আগে এই চারটি প্রাথমিক বিষয় বা অনুবন্ধ আমাদের বোঝা দরকার।
সর্বপ্রথম প্রশ্ন – আমাদের আলোচ্য
বিষয়টি কি? বিষয় হলো ভক্তি। পরবর্তী সূত্রে নারদ ব্যাখ্যা
করছেন ভক্তি কি বা ভক্তি কাকে বলে? দ্বিতীয়ত, কার জন্য এই ভক্তিতত্ত্ব অর্থাৎ কে এর অধিকারি? যারা
এই পথ অনুসরণ করতে উৎসুক তাদের লক্ষ্য করেই নারদ ভক্তির ব্যাখ্যা করছেন। যারা নিছক
কৌতুহলের বশবর্তী বা বৌদ্ধিক চর্চায় আগ্রহী তাদের জন্য এ গ্রন্থ নয়। যারা এই
শিক্ষাকে জীবনে রূপায়িত এবং এই পথ অনুসরণ করে জীবনকে গঠন করতে চায় তারাই এই
ভক্তিশাস্ত্রের অধিকারি। এই শাস্ত্রে যা বলা হয়েছে জীবনে তার এক বিশেষ মূল্য আছে।
এই কথাটি ভাল করে বুঝতে হবে। ভক্তিমার্গের উপযুক্ত অধিকারি কে? এমন অনেক মানুষ আছেন যাঁরা নিজেদের বর্তমান অবস্থায় সন্তুষ্ট নন; যাঁদের জীবনে একটা অভাববোধ আছে অথচ কেমন করে সেই অভাবটা দূর করা যায় তা
বুঝতে পারছেন না অর্থাৎ তাঁরা কিছু একটা খুঁজছেন কিন্তু কিভাবে তা পাবেন তা জানেন
না। এই ভক্তিশাস্ত্র তাঁদেরই সাহায্য করবে, তাঁরাই এই
শাস্ত্র-জিজ্ঞাসার অধিকারি। মূল কথা, যাঁরা তাঁদের বর্তমান
অবস্থাতেই সন্তুষ্ট তাঁদের অন্যকিছু জানবার বা শিখবার আগ্রহ থাকতে পারে না। এসব
ব্যক্তির কাছে যে কোন বিদ্যাই নিরর্থক। যারা এই ভক্তির বিষয় জানবার প্রয়োজনই অনুভব
করে না এ বিদ্যা তাদের কোন কাজেই লাগতে পারে না। কেবলমাত্র যাদের এই মানসিক
প্রস্তুতি আছে, যা তাদের এই বিদ্যা গ্রহণের যোগ্য করে তুলেছে,
যারা এই পথ অনুসরণ করে জীবনে উপকৃত, তাদের
জন্যই এই শাস্ত্রের অবতারণা।
সুতরাং দেখা যাচ্ছে যে এর জন্য
একটা বিশেষ মানসিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রয়োজন। ভক্তিমার্গ সম্পর্কে জানতে হলে অধিকারির
সেই বিশেষ যোগ্যতাটি কি?
এরজন্য একটিমাত্র বস্তুর প্রয়োজন তা হলো ভক্তিলাভের জন্য আন্তরিক
ইচ্ছা, একনিষ্ঠ আগ্রহ। ভক্তিলাভের আকুলতা ছাড়া অন্য কোনো
অবান্তর গুণের প্রয়োজন নেই। তবে এই আকুলতা হবে আন্তরিক। কি করে ভক্তি লাভ হবে,
ভক্তিপথে অগ্রসর হবেন কিভাবে, সাধক নিরন্তর
সেই ভাবনায় নিরত থাকবেন।
ইন্দ্রিয়জ ভোগসুখে মত্ত থাকলে
স্বভাবতই হৃদয়ে ভক্তিলাভের বাসনা জাগে না। আর এটাও স্বাভাবিক যে ঈশ্বরীয় প্রসঙ্গ
শোনবার জন্য তাদের কোন আগ্রহই হয় না। নারী বা পুরুষ যিনি হোন তিনি যদি ঘোর নাস্তিক
হন বা ভগবানে তাঁর বিশ্বাস না থাকে, এ ভক্তিতত্ত্বে তাঁর কোন লাভ হপবে না।
শ্রীমদ্ভগবদগীতায় তাই বলেছেন,
‘ইদং তে নাহতপস্কায় নাহভক্তায় কদাচন।
ন চাহশুশ্রূষবে বাচ্যং ন চ মাং
যোহভ্যসূয়তি।।’ (১৮|৬৭)
--- এই রহস্যময় উপদেশ কখনও তপস্যাবিহীন, ভক্তিহীন এবং শুনতে অনিচ্ছুক
ব্যক্তিকে বা যারা আমাকে অসূয়া করে, আমার মধ্যে দোষ
অনুসন্ধান করে তাদের বলবে না। স্পষ্ট কথা এই যে প্রকৃত অধিকারি ব্যক্তিই এই
ভক্তিতত্ত্বে প্রবেশের যোগ্য।
আরও একটি বিষয় আছে।
ভক্তিমার্গের অনুসরণ করবার জন্য বিদগ্ধ পণ্ডিত হওয়ার কোন প্রয়োজন নেই। এমনকি
অক্ষরজ্ঞান না থাকলেও কিছু এসে যায় না। বেদ-বেদান্ত বা অন্য কোন শাস্ত্রদর্শন তো
দূরের কথা, ভক্তিযোগ অনুসরণ করতে হলে সামাজিক পদমর্যাদারও কোন প্রশ্ন নেই। ভক্তিপথ
সকলের জন্য, সর্বশ্রেণীর জন্য। এ পথের আরও একটি বড় সুবিধা হল
এখানে বয়সের কোন বিচার নেই, বাধানিষেধ নেই। কেউ কেউ হয়তো
জন্মান্তরীন সংস্কারবশত অতি শৈশবকাল থেকেই ভগবানের প্রতি আকর্ষণ অনুভব করেম। এঁদের
মধ্যে প্রহ্লাদ, স্বয়ং নারদ, শুকদেব ও
আরোও অনেকের নাম ইজ্জ্বল হয়ে আছে, যাঁরা আজন্ম ঈশ্বরানুরাগী।
যাগযজ্ঞাদির জন্য কিছু বিশেষ যোগ্যতার দরকার হয়, কিন্তু
ভক্তিপথে অনুরাগ ব্যাতীত অন্য কোন যোগ্যতার অপেক্ষা রাখে না। এ পথে অত্যুন্নত
নৈতিক চরিত্রের অধিকারি হওয়া আবশ্যিক নয়, অতি সাধারণ মানুষও
এই পথ অনুসরণ করতে পারেন। ভোগসুখের ইচ্ছাও যদি থাকে, কিন্তু
সেই ইচ্ছা যদি অত্যন্ত তীব্র হয়ে সাধককে আধ্যাত্মিক আকাঙ্ক্ষা থেকে দূরে সরিয়ে না
রাখে, তাহলে সেটাও বাধা হয়ে দাঁড়ায় না। এই-ই হলো এই পথের
যোগ্যতা বা অধিকার।
ভাগবতে প্রশ্ন করা হয়েছে, কে ভক্তিযোগী? উত্তরে বলা হচ্ছে, যার শ্রীভগবানের লীলার প্রতি
আকর্ষণ আছে, অনুরাগ আছে ভক্তিযোগ তারই সহায়ক। ভগবানের কথা
শুনতে শুনতে যেভাবেই হোক তাঁর প্রতি তার আগ্রহ জন্মেছে, একটা
আকর্ষণবোধ এসেছে। সে ব্যক্তির অত্যধিক ইন্দ্রিয়াসক্তি আছে তাও না, আবার তীব্র ত্যাগ-বৈরাগ্যের আকাঙ্ক্ষা আছে তা-ও না। সে যেন মধ্যপথে রয়েছে।
‘নাতিসক্তঃ নাতিনির্বিন্নঃ’ সেক্ষেত্রে
তার একটিমাত্র যোগ্যতাই বিবেচ্য যে তার ভক্তিপথে যাবার আগ্রহ আন্তরিক কিনা। যদি তা
হয়, কেবলমাত্র মুখের কথা না হয় তবে এপথ নিঃসন্দেহে তাকে
এগিয়ে নিয়ে যাবে।
এতক্ষণে যা বললাম, তাতে এটা স্পষ্ট
যে আত্যান্তিক ইন্দ্রিয়সুখে মগ্ন ব্যক্তির মনে স্বভাবতই ভগবানের কথা শুনবার জন্য
কোন আগ্রহই জাগতে পারে না। আবার যদি কেউ এতদূর পবিত্র হয় যে সর্বতোভাবে সকল
সুখভোগে বিতস্পৃহ হয়ে তার পক্ষে জ্ঞানযোগ বা অন্য কোন পথ অবলম্বন করা সম্ভব। অবশ্য
ভক্তির পথও অবলম্বন করতে পারে কিন্তু অন্য পথও তার কাছে অবারিত বলে সে যে
বিশেষভাবে এই পথের জন্য চিহ্নিত তা নয়। কিন্তু যিনি অতদূর পবিত্র নন যে সকল
কামনা-বাসনার ঊর্ধ্বে বা যিনি সেই পরম সত্যকে জানবার জন্য সমগ্র মনপ্রাণ এখনও
নিয়োগ করতে পারেননি, তাঁর ভক্তিযোগই প্রশস্ত।
প্রশ্ন উঠতে পারে, যার সেই ব্যকুলতা
জেগেছে সে তো ভক্তিলাভ করেইছে --- তার আর ভক্তিযোগ আলোচনার কি প্রয়োজন? সেক্ষেত্রে প্রয়োজন এইজন্যই যে সেই ব্যাকুলতা, আর্তি
যেন সে সঠিক পথে পরিচালিত হয়, ভুল পথে গিয়ে তা যেন অঙ্কুরেই
বিনষ্ট না হয়। দ্বিতীয়ত, সাধকের মনে লক্ষ্য সম্বন্ধে যেন কোন
ভ্রান্তি বা সংশয় না থাকে। কোন্ পথ ধরে সে অগ্রসর হবে, কি
কি ধরনের বাধাবিঘ্ন আসতে পারে এবং লক্ষ্যবস্তু কি এ সম্বন্ধে একটা স্পষ্ট ধারণার
জন্যই ভক্তিযোগ সম্বন্ধে জানা প্রয়োজন।
কারও জ্ঞানপিপাসা
নিবৃত্তির জন্যই ভক্তিযোগ নয়। এই যোগ আমাদের জীবনের সঙ্গে জড়িত। একে লঘুভাবে দেখা
বা নিছক আলোচনার বস্তু বলে গ্রহণ করা অনুচিত। এটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
উদাহরণস্বরূপ, একজন দার্শনিক, যিনি শাস্ত্রীয় কৌতুহল নিবৃত্তি ও
জ্ঞানের পরিধি বাড়াবার জন্য বহু গ্রন্থপাঠ করেন কিন্তু সেই অধীত জ্ঞানের সঙ্গে
তাঁর কোন যোগই থাকে না। তাঁর পুঁথিগত দর্শন একরকম আর তাঁর জীবনযাত্রা হয়তো
সম্পূর্ণ ভিন্নরকম। উচ্চমার্গের দর্শনচর্চা করেন বলে তাঁর জীবনও যে তদনুযায়ী হবে
তা নয়। কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে একজন দর্শনশাস্ত্রের অধ্যাপক অনেক গভীর তত্ত্বকথা
বলে থাকেন, কিন্তু তিনি যে নিজের জীবনে সেই তত্ত্বকে মেনে
চলবেন এর কোনও নিশ্চয়তা নেই। আমাদের ছাত্রজীবনে এইরকম একজন অধ্যাপকের সংস্পর্শে
এসেছিলাম বলেই একথা বিশেষভাবে জানি। তাঁর পাণ্ডিত্য ছিল অগাধ, তিনি অনেক জটীল বিমূর্ত বিষয়ের আলোচনা অতি চমৎকারভাবে করতেন এবং অধ্যাপক
হিসাবেও যশস্বী ছিলেন। কিন্তু অধীত শাস্ত্রের জ্ঞান তাঁর নিজ জীবনে প্রতিফলিত হওয়া
তো দূরের কথা, সাধারণের থেকেও অনেক নিম্ন ছিল তাঁর
জীবনযাত্রার মান। তাঁর খ্যাতি ছিল, কিন্তু দর্শনশাস্ত্রের
সঙ্গে তাঁর জীবনের মেলবন্ধন হয়নি।
সেইজন্যই দেবর্ষি নারদ
অধিকারি সম্বন্ধে সচেতন করে বলছেন এই ধরনের ব্যক্তির জন্য ভক্তিযোগ নয়। যাঁরা এই
বিদ্যাকে শ্রদ্ধার সঙ্গে অধিগ্রহন করে সেই জীবনকে রূপয়ান্তরিত করতে চান তাঁদের
উদ্দেশ্যেই তা৬র এই ভক্তিশাস্ত্র।
এতক্ষণ পর্যন্ত আমরা
বিষয় ও অধিকারি নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা করেছি। এবার আসি শাস্ত্রপাঠের প্রয়োজনীয়তা কি
সেই তৃতীয় বিষয়ে। এই শাস্ত্রের অনুধ্যানে লাভ হবে পরমা ভক্তি। এই ভক্তি সাধ্য বা
উদ্দেশ্য। চতুর্থ বিষয় হল সম্বন্ধ। ভক্তিলাভ যিনি করতে চান কেবল মাত্র পথ আর
উদ্দেশ্য সম্বন্ধে অবধানই যথেষ্ট নয়, পরমাভক্তিলাভই সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ। শুধুই
গ্রন্থ পাঠ করে তাঁর ভক্তি হবে না। ভক্তিমার্গ সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করে অভীষ্ট
লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য তাঁকে সাধন করতে হবে। জ্ঞানমার্গে ব্রক্ষ্মের সঙ্গে
একাত্মতা অনুভবই লক্ষ্য এবং বিবেকবচারই প্রধান সাধন বা লক্ষেয় পৌঁছবার পথ।
জ্ঞানমার্গে বুদ্ধির সাহায্যে এতটুকুও অগ্রসর হওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু ভক্তিপথে
কেবলমাত্র বুদ্ধির সাহায্যে এতটুকুও অগ্রসর হওয়া সম্ভব নয়। ভক্তিলাভের প্রয়াসই
এখানে বড় কথা, ভক্তিই এখানে সাধ্য ও সাধন দুই-ই। তাই ভাগবত
বলছেন, ‘ভক্ত্যা সঞ্জাতয়া ভক্ত্যা বিভ্রত্যুৎপুলকাং তনুম্’
(১১।৩।৩১)। ভক্তিসাধনের দ্বারাই পরমাভক্তির ভূমিতে উপনীত হতে হবে।
অর্থাৎ বৈধী ভক্তির পথ ধরেই প্রবর্তক সাধককে পৌঁছতে হবে ভক্তির পরাকাষ্ঠাতে বা
পরমপ্রেমে। কিন্তু পরমপ্রেম তো পরিণতি। তার আগে যাত্রার প্রারম্ভে ভক্তির একটু
আভাস না পেলে তো আর যাত্রা শুরু করা যাবে না। [লক্ষ্যে উপনীত হবার জন্য এই যে পথের
সঙ্কেত, এটিই উভয়ের মধ্যে সম্বন্ধ।] এই ভক্তির প্রেরণাই পথের
শেষে পরমপ্রেমে পরিণতি লাভ করবে।
(স্বামী
ভূতেশানন্দজী কৃত অনুবাদ ও ব্যাখ্যা)
=========================================================================
No comments:
Post a Comment